ডায়াবেটিস হলে কি বারবার প্রস্রাব হয়? কারণ ও করণীয়

ডায়াবেটিস হলে কি বারবার প্রস্রাব হয়? হ্যাঁ—রক্তে গ্লুকোজ যথেষ্ট বেড়ে গেলে ঘন ঘন ও বেশি পরিমাণে প্রস্রাব হওয়া ডায়াবেটিসের পরিচিত লক্ষণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রস্রাব হওয়াকে পলিইউরিয়া বলা হয়। অনেকের রাতে বারবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে হয়, যাকে নকচুরিয়া বলা হয়। তবে ঘন ঘন প্রস্রাব হলেই ডায়াবেটিস নিশ্চিত নয়। মূত্রনালির সংক্রমণ, গর্ভাবস্থা, প্রোস্টেটের সমস্যা, অতিরিক্ত পানি বা ক্যাফেইন পান, কিছু ওষুধ এবং আরও অনেক অবস্থায় একই সমস্যা হতে পারে। তাই কারণ অনুমান না করে উপসর্গের ধরন, সঙ্গে থাকা লক্ষণ এবং মানসম্মত রক্ত পরীক্ষা বিবেচনা করা জরুরি।

চিকিৎসা-সতর্কতা: এই নিবন্ধটি সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার জন্য; ব্যক্তিগত রোগনির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। নিজের মতো করে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন শুরু, বন্ধ বা ডোজ পরিবর্তন করবেন না। বারবার প্রস্রাবের সঙ্গে বমি, বিভ্রান্তি, শ্বাসকষ্ট, তীব্র পানিশূন্যতা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

Table of Contents

ডায়াবেটিসে বারবার প্রস্রাব হয় কেন?

খাবারের কার্বোহাইড্রেট ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি হয়। ইনসুলিন গ্লুকোজকে রক্ত থেকে কোষে প্রবেশ করে শক্তি হিসেবে ব্যবহারে সহায়তা করে। ডায়াবেটিসে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে অথবা ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করলে রক্তে গ্লুকোজ জমে যায়। কিডনি সাধারণত রক্ত ছেঁকে প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ আবার শরীরে ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু রক্তে গ্লুকোজ অনেক বেড়ে গেলে কিডনি সবটুকু পুনরায় শোষণ করতে পারে না। তখন গ্লুকোজ প্রস্রাবে চলে আসে।

প্রস্রাবে থাকা গ্লুকোজ পানি টেনে নেয়। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পানি প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়। এই প্রক্রিয়াকে অসমোটিক ডাইইউরেসিস বলা হয়। তাই শুধু প্রস্রাবের সংখ্যা নয়, মোট পরিমাণও বাড়তে পারে। শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মুখ শুকানো, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা ডিহাইড্রেশন দেখা দিতে পারে। তৃষ্ণার কারণে বেশি পানি পান করলে আবার প্রস্রাব বাড়ে—এটি একটি চক্রের মতো মনে হতে পারে।

তবে কারও গ্লুকোজ সামান্য বেড়েছে মানেই প্রস্রাব অবশ্যই বেড়ে যাবে এমন নয়। ব্যক্তিভেদে কিডনির গ্লুকোজ সামলানোর ক্ষমতা, পানীয় গ্রহণ, ওষুধ, বয়স ও কিডনির অবস্থার পার্থক্য থাকে। আবার কিছু আধুনিক ডায়াবেটিসের ওষুধ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রস্রাবের সঙ্গে গ্লুকোজ বের করে; সে ক্ষেত্রেও প্রস্রাব বাড়তে পারে। তাই উপসর্গের ব্যাখ্যায় চিকিৎসককে সব ওষুধের নাম জানাতে হবে।

ঘন ঘন প্রস্রাব আর বেশি পরিমাণ প্রস্রাব কি একই?

দুটি বিষয় আলাদা। ফ্রিকোয়েন্সি মানে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বার বাথরুমে যাওয়া; প্রতিবার অল্প প্রস্রাবও হতে পারে। পলিইউরিয়া মানে ২৪ ঘণ্টায় মোট প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশি হওয়া। ডায়াবেটিসজনিত অসমোটিক ডাইইউরেসিসে সাধারণত পরিমাণও বাড়ে। অন্যদিকে মূত্রনালির সংক্রমণ বা অতিসক্রিয় মূত্রাশয়ে খুব তাড়াহুড়া অনুভূত হলেও প্রতিবার অল্প পরিমাণ প্রস্রাব হতে পারে। এই পার্থক্য কারণ খুঁজতে সহায়ক।

দিনে ঠিক কতবার প্রস্রাব “স্বাভাবিক” তার একটিমাত্র সংখ্যা নেই। পানি, আবহাওয়া, খাবার, বয়স, গর্ভাবস্থা, ঘুম ও ওষুধ অনুযায়ী পরিবর্তন হয়। তাই নিজের আগের অভ্যাসের তুলনায় নতুন পরিবর্তন—বিশেষ করে রাতে কয়েকবার ওঠা, প্রচুর প্রস্রাব, প্রচণ্ড তৃষ্ণা ও ওজন কমা—বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাতে বারবার প্রস্রাব কি ডায়াবেটিসের লক্ষণ?

হতে পারে। রাতে ঘুম ভেঙে একাধিকবার প্রস্রাব করতে হওয়া উচ্চ রক্তে গ্লুকোজের একটি সংকেত হতে পারে, বিশেষ করে সঙ্গে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা বা ওজন কমা থাকলে। কিন্তু রাতের নকচুরিয়ার আরও কারণ আছে—ঘুমের আগে বেশি পানি, চা বা কফি পান, পা ফুলে থাকা, ঘুমের ব্যাঘাত, প্রোস্টেট বড় হওয়া, মূত্রাশয়ের সমস্যা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, হৃদ্‌রোগ বা কিডনির সমস্যা। শুধু রাতের প্রস্রাব দেখে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা যায় না।

কোন লক্ষণগুলো একসঙ্গে থাকলে ডায়াবেটিস সন্দেহ বাড়ে?

  • স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পরিমাণে ও বেশি বার প্রস্রাব;
  • অতিরিক্ত তৃষ্ণা এবং পানি পান করেও মুখ শুকিয়ে থাকা;
  • খাবার ঠিক থাকলেও অকারণে ওজন কমে যাওয়া;
  • অস্বাভাবিক ক্ষুধা, ক্লান্তি বা দুর্বলতা;
  • চোখে ঝাপসা দেখা;
  • কাটা বা ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া;
  • বারবার ত্বক, যোনিপথ বা মূত্রনালির সংক্রমণ;
  • হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব।

টাইপ ১ ডায়াবেটিসে লক্ষণ কয়েক দিন বা সপ্তাহে দ্রুত শুরু হতে পারে। টাইপ ২ ডায়াবেটিস ধীরে এগোয় এবং দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তাই লক্ষণ না থাকা ডায়াবেটিস নেই—এমন প্রমাণ নয়।

বারবার প্রস্রাবের অন্যান্য সাধারণ কারণ

মূত্রনালির সংক্রমণ বা UTI

UTI-তে বারবার ও তাড়াহুড়া করে প্রস্রাবের অনুভূতি হয়, কিন্তু প্রতিবার অল্প প্রস্রাব হতে পারে। সঙ্গে জ্বালা, তলপেটে ব্যথা, দুর্গন্ধযুক্ত বা ঘোলা প্রস্রাব থাকতে পারে। জ্বর, কাঁপুনি, বমি বা পিঠের এক পাশে ব্যথা হলে সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে থাকতে পারে; দ্রুত চিকিৎসা দরকার। ডায়াবেটিসে UTI-এর ঝুঁকি বাড়তে পারে, কিন্তু UTI হওয়া নিজে ডায়াবেটিসের প্রমাণ নয়।

গর্ভাবস্থা

হরমোনগত পরিবর্তন, কিডনিতে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং বড় হতে থাকা জরায়ুর চাপের কারণে গর্ভাবস্থায় প্রস্রাব বাড়তে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সাধারণত লক্ষণহীন থাকে; তাই ঘন প্রস্রাবকে কেবল গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক পরিবর্তন বা কেবল ডায়াবেটিস—কোনোটিই ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রসূতি চিকিৎসকের নির্ধারিত স্ক্রিনিং অনুসরণ করুন।

প্রোস্টেট ও মূত্রাশয়ের সমস্যা

পুরুষদের প্রোস্টেট বড় হলে প্রস্রাব শুরু করতে দেরি, দুর্বল ধারা, পুরোপুরি খালি না হওয়ার অনুভূতি এবং রাতে বারবার প্রস্রাব হতে পারে। অতিসক্রিয় মূত্রাশয়ে হঠাৎ তীব্র বেগ ও কখনও প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার সমস্যা হয়। দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিসে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে কারও মূত্রাশয়ের অনুভূতি বা খালি করার ক্ষমতাও বদলাতে পারে; তখন শুধু বর্তমান গ্লুকোজ রিডিং দেখে কারণ বোঝা যায় না। এসব ক্ষেত্রে মোট প্রস্রাবের পরিমাণ সবসময় বেশি হয় না।

অতিরিক্ত পানি, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল

অল্প সময়ে অনেক পানি পান করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রস্রাব বাড়ে। চা, কফি, এনার্জি ড্রিঙ্ক ও কিছু কোমল পানীয়ের ক্যাফেইন মূত্রাশয়ের বেগ বা প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়াতে পারে। অ্যালকোহলও ডাইইউরেসিস ও ডিহাইড্রেশনে ভূমিকা রাখে। উপসর্গ মূল্যায়নের সময় কোন পানীয় কতটা ও কখন পান করছেন লিখে রাখুন। কিন্তু প্রস্রাব কমাতে ইচ্ছাকৃতভাবে পানি খুব কমিয়ে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।

ডাইইউরেটিক ও অন্যান্য ওষুধ

উচ্চ রক্তচাপ বা শরীরে পানি জমার চিকিৎসায় ব্যবহৃত “ওয়াটার পিল” বা ডাইইউরেটিক প্রস্রাব বাড়ায়। কিছু SGLT2 inhibitor শ্রেণির ডায়াবেটিসের ওষুধ প্রস্রাবের সঙ্গে গ্লুকোজ বের করে এবং প্রস্রাব বা যৌনাঙ্গের সংক্রমণের ঝুঁকিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ওষুধ নিজে বন্ধ করবেন না; সময়, ডোজ ও উপসর্গ চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।

অন্যান্য সম্ভাব্য অবস্থা

ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস নামের একটি বিরল ও ডায়াবেটিস মেলিটাস থেকে আলাদা রোগে প্রচুর পাতলা প্রস্রাব ও তৃষ্ণা হতে পারে। কিডনির কিছু রোগ, রক্তে ক্যালসিয়াম বেড়ে যাওয়া, স্নায়বিক রোগ, উদ্বেগ বা ঘুমের সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গে শুধু রক্তের গ্লুকোজ নয়, চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্রাব পরীক্ষা, কিডনি ফাংশন, ইলেক্ট্রোলাইট বা অন্য পরীক্ষা দিতে পারেন।

ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ চিনবেন কীভাবে?

অতিরিক্ত প্রস্রাবে শরীর থেকে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট কমে যেতে পারে। মুখ ও জিহ্বা শুকানো, তীব্র তৃষ্ণা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া, ত্বক শুষ্ক লাগা বা প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। তবে উচ্চ গ্লুকোজে প্রচুর প্রস্রাব হলেও কখনও রং খুব গাঢ় নাও হতে পারে। বয়স্ক, গর্ভবতী, শিশু এবং কিডনি বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ঝুঁকি বেশি। হৃদ্‌রোগ বা কিডনি রোগে তরল গ্রহণের সীমা থাকলে নিজে থেকে অতিরিক্ত পানি না খেয়ে চিকিৎসকের নির্দেশ মানুন।

কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?

অতিরিক্ত প্রস্রাব ও তৃষ্ণার সঙ্গে নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (DKA), হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট (HHS), তীব্র সংক্রমণ বা গুরুতর ডিহাইড্রেশন হতে পারে। দ্রুত জরুরি বিভাগে যান:

  • বারবার বমি, তীব্র পেটব্যথা বা পানি ধরে রাখতে না পারা;
  • দ্রুত ও গভীর শ্বাস, শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসে ফলের মতো গন্ধ;
  • অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হওয়া;
  • দাঁড়ালে তীব্র মাথা ঘোরা, অতি দুর্বলতা বা দ্রুত হৃদস্পন্দন;
  • খুব বেশি গ্লুকোজ রিডিংয়ের সঙ্গে অসুস্থ বোধ করা;
  • জ্বর, কাঁপুনি, পিঠের এক পাশে ব্যথা বা প্রস্রাবে রক্ত;
  • টাইপ ১ ডায়াবেটিসে উচ্চ গ্লুকোজের সঙ্গে কিটোন বা DKA-এর লক্ষণ।

DKA সাধারণত টাইপ ১-এ বেশি হলেও টাইপ ২-এও হতে পারে। HHS টাইপ ২ ডায়াবেটিসে অত্যন্ত উচ্চ গ্লুকোজ ও তীব্র ডিহাইড্রেশনের সঙ্গে বেশি দেখা যায়। ঘরে শুধু পানি খেয়ে বা অতিরিক্ত ওষুধ নিয়ে এসব অবস্থা সামলানোর চেষ্টা করবেন না।

ডায়াবেটিস নিশ্চিত করার পরীক্ষা ও স্বীকৃত সীমা

ঘন প্রস্রাব ডায়াবেটিসের সন্দেহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু রোগ নির্ণয়ে মানসম্মত রক্ত পরীক্ষা লাগে। গর্ভবতী নন এমন প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ সীমা হলো:

  • HbA1c: ৫.৭ শতাংশের নিচে স্বাভাবিক, ৫.৭–৬.৪ শতাংশ প্রিডায়াবেটিস এবং ৬.৫ শতাংশ বা বেশি ডায়াবেটিসের সীমা। এটি গত প্রায় দুই থেকে তিন মাসের গড় গ্লুকোজ সম্পর্কে ধারণা দেয়।
  • খালি পেটে প্লাজমা গ্লুকোজ: ১০০ mg/dL-এর নিচে স্বাভাবিক, ১০০–১২৫ প্রিডায়াবেটিস এবং ১২৬ বা বেশি ডায়াবেটিসের সীমা। সাধারণত অন্তত আট ঘণ্টা ক্যালরিযুক্ত খাবার বা পানীয় ছাড়া থাকতে হয়।
  • ৭৫ গ্রাম OGTT-এর দুই ঘণ্টা পর: ১৪০ mg/dL-এর নিচে স্বাভাবিক, ১৪০–১৯৯ প্রিডায়াবেটিস এবং ২০০ বা বেশি ডায়াবেটিসের সীমা।
  • র‌্যান্ডম প্লাজমা গ্লুকোজ: ক্লাসিক হাইপারগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ বা হাইপারগ্লাইসেমিক সংকটের সঙ্গে ২০০ mg/dL বা বেশি হলে ডায়াবেটিস নির্দেশ করতে পারে।

স্পষ্ট হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা সংকট না থাকলে সাধারণত অন্য দিনে একই বা ভিন্ন পরীক্ষায় ফল নিশ্চিত করতে হয়। ঘরের গ্লুকোমিটার নজরদারির জন্য উপকারী, কিন্তু রোগ নির্ণয়ে ল্যাব পরীক্ষা প্রয়োজন। রক্তস্বল্পতা, কিডনি রোগ, সাম্প্রতিক রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থা বা কিছু হিমোগ্লোবিন ভ্যারিয়েন্টে HbA1c ভুল ধারণা দিতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের পরীক্ষার পদ্ধতি ও কাট-অফ আলাদা।

বারবার প্রস্রাব হলে কী করবেন?

  1. লক্ষণ নথিভুক্ত করুন: কখন, কতবার এবং আনুমানিক কতটা প্রস্রাব হচ্ছে; রাতে কয়বার উঠছেন; কতটা পানি, চা বা কফি পান করছেন—দুই থেকে তিন দিনের ডায়েরি রাখুন।
  2. সঙ্গে থাকা লক্ষণ লিখুন: তৃষ্ণা, জ্বালা, জ্বর, ওজন কমা, ঝাপসা দেখা, বমি, পিঠে ব্যথা বা প্রস্রাবে রক্ত আছে কি না জানান।
  3. ওষুধের তালিকা নিন: ডাইইউরেটিক, ডায়াবেটিসের ওষুধ, হারবাল পণ্য ও সাপ্লিমেন্টসহ সব নাম চিকিৎসককে দেখান।
  4. সময়মতো পরীক্ষা করুন: নতুন উপসর্গ কয়েক দিন থাকলে বা ঝুঁকি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্ত ও প্রয়োজনমতো প্রস্রাব পরীক্ষা করুন।
  5. নিরাপদে পানি পান করুন: তৃষ্ণা অনুযায়ী সাধারণ পানি পান করুন এবং চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন। কিডনি বা হৃদ্‌রোগে তরল সীমা থাকলে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসরণ করুন।
  6. ডায়াবেটিস থাকলে সিক-ডে পরিকল্পনা জানুন: অসুস্থতার সময় কত ঘন ঘন গ্লুকোজ বা কিটোন মাপবেন এবং কখন সাহায্য নেবেন—চিকিৎসকের লিখিত নির্দেশ রাখুন।

কী করবেন না?

  • প্রস্রাব কমানোর জন্য পানি প্রায় বন্ধ করবেন না; এতে ডিহাইড্রেশন আরও বাড়তে পারে।
  • একটি গ্লুকোমিটার রিডিং দেখে নিজে রোগ নির্ণয় বা ওষুধ শুরু করবেন না।
  • উচ্চ রিডিং দেখে নিজের মতো অতিরিক্ত ইনসুলিন বা ট্যাবলেট নেবেন না; হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।
  • প্রস্রাবে জ্বালা হলেই পুরোনো বা অন্যের অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।
  • “চিনি বের হয়ে যাচ্ছে, তাই সমস্যা নেই”—এমন ধারণা করবেন না; এটি অনিয়ন্ত্রিত গ্লুকোজ ও ডিহাইড্রেশনের সংকেত হতে পারে।
  • জরুরি লক্ষণকে পরদিনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করাবেন না।

একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ

ধরা যাক, ৪৮ বছর বয়সী হাসান গত এক মাস ধরে রাতে তিন-চারবার প্রস্রাব করতে ওঠেন এবং অফিসে আগের তুলনায় অনেক বেশি পানি পান করেন। প্রতিবার প্রস্রাবের পরিমাণও বেশি, কিন্তু জ্বালা বা জ্বর নেই। তিনি প্রথমে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে থাকার কারণে তৃষ্ণা হচ্ছে ভাবেন। পরে ক্লান্তি ও ঝাপসা দেখা যোগ হলে চিকিৎসকের কাছে যান। চিকিৎসক পানীয় ও ওষুধের ইতিহাস নেন, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং ল্যাবে খালি পেটের গ্লুকোজ ও HbA1c দেন। ফল ডায়াবেটিসের সীমায় আসে এবং পুনরায় পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়। ব্যক্তিগত অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসা, খাবারের পরিকল্পনা, পানি পান ও ফলোআপ শুরু করার পর তাঁর তৃষ্ণা ও নকচুরিয়া কমে। এটি কোনো নির্দিষ্ট রোগীর কেস নয়; লক্ষণের ধরন ও পরীক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য একটি শিক্ষামূলক উদাহরণ।

ডায়াবেটিস ও বারবার প্রস্রাব নিয়ে FAQ

ডায়াবেটিসে দিনে কতবার প্রস্রাব হয়?

একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। পানি, আবহাওয়া ও ওষুধের প্রভাব থাকে। নিজের স্বাভাবিকের তুলনায় সংখ্যা ও মোট পরিমাণ বাড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাতে বারবার প্রস্রাব হলেই কি ডায়াবেটিস?

না। উচ্চ গ্লুকোজ একটি কারণ, তবে প্রোস্টেট, মূত্রাশয়, পানীয়, ঘুম, হৃদ্‌রোগ বা কিডনির সমস্যাও হতে পারে।

ডায়াবেটিসের প্রস্রাবে কি জ্বালা হয়?

উচ্চ গ্লুকোজ একা সাধারণত জ্বালার প্রধান কারণ নয়। জ্বালা হলে UTI বা অন্য সমস্যা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

প্রস্রাব কমাতে পানি কম খাব কি?

নিজে থেকে পানি অত্যন্ত কমাবেন না; ডিহাইড্রেশন হতে পারে। হৃদ্‌রোগ বা কিডনি রোগে চিকিৎসকের তরল-নির্দেশ মানুন।

গ্লুকোমিটারে একবার বেশি ফল কি ডায়াবেটিস প্রমাণ করে?

সাধারণত নয়। মানসম্মত ল্যাব পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে পুনরায় নিশ্চিতকরণ দরকার। জরুরি লক্ষণ থাকলে অবশ্য অপেক্ষা করবেন না।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এলে ঘন প্রস্রাব কি কমে?

উচ্চ গ্লুকোজ কারণ হলে নিরাপদ নিয়ন্ত্রণে প্রস্রাব ও তৃষ্ণা সাধারণত কমে। না কমলে অন্য কারণ খুঁজতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন দরকার।

প্রস্রাবে পিঁপড়া ধরলে কি ডায়াবেটিস বোঝা যায়?

না। এটি নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা নয়। রক্তের মানসম্মত গ্লুকোজ বা HbA1c পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করতে হয়।

কখন জরুরি হাসপাতালে যাব?

বমি, পেটব্যথা, দ্রুত গভীর শ্বাস, শ্বাসে ফলের গন্ধ, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া বা তীব্র ডিহাইড্রেশন হলে জরুরি বিভাগে যান।

শেষ কথা

ডায়াবেটিসে বারবার ও বেশি পরিমাণে প্রস্রাব হওয়ার মূল কারণ হলো প্রস্রাবের গ্লুকোজ পানি টেনে বের করে দেওয়া—অর্থাৎ অসমোটিক ডাইইউরেসিস। কিন্তু ঘন প্রস্রাবের প্রতিটি ঘটনাই ডায়াবেটিস নয়। জ্বালা ও অল্প প্রস্রাব UTI, দুর্বল ধারা প্রোস্টেটের সমস্যা, আর অতিরিক্ত চা-কফি বা ডাইইউরেটিকের প্রভাবও হতে পারে। নতুন পরিবর্তনের সঙ্গে তৃষ্ণা, ওজন কমা, ক্লান্তি বা ঝাপসা দেখা থাকলে দ্রুত ল্যাব পরীক্ষা করুন। জরুরি লক্ষণ থাকলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসা নিন; আর পানি বা ওষুধ নিজের মতো পরিবর্তন না করে কারণভিত্তিক চিকিৎসা অনুসরণ করুন।

তথ্যসূত্র

মন্তব্য করুন