ডায়াবেটিস কী? ডায়াবেটিস হওয়ার কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন

ডায়াবেটিস কী—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, এটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় অবস্থা যেখানে শরীর রক্তের গ্লুকোজ বা শর্করা স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আমরা ভাত, রুটি, ফল, দুধসহ নানা খাবার থেকে গ্লুকোজ পাই। এই গ্লুকোজ শরীরের কোষে ঢুকে শক্তি তৈরি করতে ইনসুলিন নামের একটি হরমোনের সাহায্য নেয়। অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না করলে, অথবা শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারলে, রক্তে গ্লুকোজ জমতে থাকে। দীর্ঘদিন এমন হলে চোখ, কিডনি, স্নায়ু, হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালিতে ক্ষতি হতে পারে।

ডায়াবেটিস মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়। সঠিক পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এবং প্রয়োজনমতো ওষুধ বা ইনসুলিনের মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবন কাটাতে পারেন। এই লেখায় ডায়াবেটিসের ধরন, কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা, জরুরি সতর্কতা এবং প্রতিরোধ সম্পর্কে প্রমাণভিত্তিক ধারণা দেওয়া হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ: এটি সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষামূলক লেখা; ব্যক্তিগত রোগনির্ণয় বা প্রেসক্রিপশন নয়। আপনার উপসর্গ, পরীক্ষার ফল, গর্ভাবস্থা, বয়স ও অন্যান্য রোগ অনুযায়ী সিদ্ধান্তের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Table of Contents

ডায়াবেটিস কীভাবে হয়?

খাবার হজম হওয়ার পর কার্বোহাইড্রেটের একটি অংশ গ্লুকোজে ভেঙে রক্তে যায়। রক্তে গ্লুকোজ বাড়লে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ ইনসুলিন নিঃসরণ করে। ইনসুলিনকে অনেকটা দরজার চাবি বলা যায়—এটি পেশি, চর্বি ও অন্যান্য কোষকে গ্লুকোজ গ্রহণের সংকেত দেয়। কোষ গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করে এবং রক্তের মাত্রা কমে আসে।

টাইপ ১ ডায়াবেটিসে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে ইনসুলিন তৈরির বিটা কোষ ধ্বংস করে। টাইপ ২ ডায়াবেটিসে প্রথমে কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দেয়, যাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। অগ্ন্যাশয় বাড়তি ইনসুলিন তৈরি করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করে; পরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি সম্ভব না হলে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায়। গর্ভাবস্থার হরমোনও কিছু নারীর শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সৃষ্টি করতে পারে।

ডায়াবেটিস কত প্রকার?

১. টাইপ ১ ডায়াবেটিস

টাইপ ১ একটি অটোইমিউন রোগ। এটি শিশু বা তরুণদের মধ্যে বেশি ধরা পড়লেও যেকোনো বয়সে হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি খুব কম বা একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করেন না, তাই বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত ইনসুলিন প্রয়োজন। খাদ্যাভ্যাস বা বেশি মিষ্টি খাওয়ার কারণে টাইপ ১ হয়—এ ধারণা ভুল। জিনগত প্রবণতা ও পরিবেশগত কিছু উদ্দীপক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে নির্দিষ্ট একজনের ক্ষেত্রে কারণ সব সময় জানা যায় না।

২. টাইপ ২ ডায়াবেটিস

এটি সবচেয়ে প্রচলিত ধরন। পরিবারে ডায়াবেটিস, বয়স বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ওজন বা কোমরের মেদ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস এবং কিছু জাতিগত বা সামাজিক বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে রোগটি কেবল অতিরিক্ত ওজনের মানুষের হয় না; স্বাভাবিক ওজনের ব্যক্তিরও টাইপ ২ হতে পারে। এর লক্ষণ ধীরে ধীরে তৈরি হওয়ায় অনেকের রোগ বহুদিন অজানা থাকে।

৩. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস

গর্ভাবস্থায় প্রথম শনাক্ত হওয়া উচ্চ রক্তশর্করাকে সাধারণভাবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়। অধিকাংশের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না, তাই নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মা ও শিশুর কিছু ঝুঁকি বাড়ে। সন্তান জন্মের পর অনেকের রক্তশর্করা স্বাভাবিক হলেও ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি থাকে; তাই প্রসব-পরবর্তী পরীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ দরকার।

৪. অন্যান্য নির্দিষ্ট ধরন

অগ্ন্যাশয়ের রোগ, কিছু হরমোনজনিত রোগ, নির্দিষ্ট ওষুধ যেমন দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহার, এবং একক জিনের পরিবর্তনের কারণে বিরল ধরনের ডায়াবেটিস হতে পারে। এগুলোর চিকিৎসা সাধারণ টাইপ ১ বা টাইপ ২ থেকে আলাদা হতে পারে। তাই শুধু রক্তশর্করার রিপোর্ট দেখে নিজের ডায়াবেটিসের ধরন নির্ধারণ করা ঠিক নয়।

ডায়াবেটিস হওয়ার প্রধান কারণ ও ঝুঁকির বিষয়

একটি মাত্র কারণ দিয়ে সব ডায়াবেটিস ব্যাখ্যা করা যায় না। ধরনভেদে কারণ ও ঝুঁকি আলাদা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো:

  • পারিবারিক ইতিহাস ও জিন: বাবা-মা বা ভাইবোনের টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু রোগ হবেই এমন নয়।
  • ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: পেশি, যকৃৎ ও চর্বির কোষ ইনসুলিনে কম সাড়া দিলে রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে পারে।
  • অতিরিক্ত ওজন ও কোমরের মেদ: বিশেষ করে পেটের ভেতরের চর্বি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত।
  • কম শারীরিক কার্যকলাপ: নিয়মিত নড়াচড়া ও ব্যায়াম পেশিকে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় বসে থাকা ঝুঁকি বাড়ায়।
  • বয়স: বয়স বাড়ার সঙ্গে টাইপ ২-এর ঝুঁকি বাড়ে, যদিও শিশু ও তরুণদেরও রোগটি হতে পারে।
  • খাদ্যাভ্যাস: নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যালরি, চিনি-মেশানো পানীয়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এবং কম আঁশযুক্ত খাদ্য ওজন ও বিপাকীয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একটি খাবার একাই ডায়াবেটিস ঘটায় না।
  • গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা PCOS: এসব ইতিহাস থাকা নারীদের ভবিষ্যতে টাইপ ২-এর ঝুঁকি বেশি।
  • উচ্চ রক্তচাপ ও অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল: এগুলো একই বিপাকীয় ঝুঁকির অংশ হতে পারে এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়।
  • ঘুম, মানসিক চাপ ও ধূমপান: দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি, অনিয়ন্ত্রিত চাপ এবং ধূমপান সামগ্রিক ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
  • ওষুধ বা অন্যান্য রোগ: স্টেরয়েডসহ কিছু ওষুধ এবং অগ্ন্যাশয় বা হরমোনের রোগ রক্তশর্করা বাড়াতে পারে। ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা যাবে না।

ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ

রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকলে কিডনি প্রস্রাবের মাধ্যমে তা বের করার চেষ্টা করে। এর ফলে বারবার প্রস্রাব ও শরীর থেকে পানি কমে অতিরিক্ত পিপাসা হতে পারে। কোষ পর্যাপ্ত গ্লুকোজ ব্যবহার করতে না পারায় ক্ষুধা, ক্লান্তি বা ওজন কমার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • বারবার প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতে;
  • অস্বাভাবিক পিপাসা ও মুখ শুকিয়ে যাওয়া;
  • বেশি ক্ষুধা লাগা;
  • কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া;
  • ক্লান্তি, দুর্বলতা বা কাজে মনোযোগ কমা;
  • চোখে ঝাপসা দেখা;
  • কাটা-ছেঁড়া বা ক্ষত শুকাতে দেরি;
  • বারবার ত্বক, প্রস্রাবের রাস্তা বা ফাঙ্গাল সংক্রমণ;
  • হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, অবশভাব বা জ্বালাপোড়া;
  • ত্বকের কিছু ভাঁজে কালচে ও মোটা দাগ, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

টাইপ ১-এর লক্ষণ কয়েক দিন বা সপ্তাহে দ্রুত দেখা দিতে পারে। টাইপ ২-এ লক্ষণ খুব মৃদু হতে পারে বা নাও থাকতে পারে। তাই লক্ষণ না থাকলেও ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে স্ক্রিনিং জরুরি।

কখন জরুরি চিকিৎসা দরকার?

বমি, পেটব্যথা, দ্রুত বা গভীর শ্বাস, ফলের মতো গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস, প্রচণ্ড দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হওয়া ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস, মারাত্মক হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এসব অবস্থায় ঘরোয়া উপায়ে অপেক্ষা না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে। অচেতন ব্যক্তিকে মুখে খাবার বা পানি দেওয়া বিপজ্জনক।

ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পরীক্ষা

চিকিৎসক উপসর্গ, ইতিহাস ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সমন্বয়ে রোগ নির্ণয় করেন। গ্লুকোমিটারের ফল পর্যবেক্ষণে সহায়ক হলেও রোগ নির্ণয়ের জন্য মানসম্মত ল্যাব পরীক্ষা প্রয়োজন। গর্ভবতী নন এমন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বহুল ব্যবহৃত সীমাগুলো নিচে দেওয়া হলো:

পরীক্ষাস্বাভাবিকপ্রিডায়াবেটিসডায়াবেটিসের সীমা
HbA1c৫.৭%-এর নিচে৫.৭%–৬.৪%৬.৫% বা বেশি
খালি পেটে প্লাজমা গ্লুকোজ১০০ mg/dL-এর নিচে১০০–১২৫ mg/dL১২৬ mg/dL বা বেশি
৭৫ গ্রাম OGTT-এর ২ ঘণ্টা পর১৪০ mg/dL-এর নিচে১৪০–১৯৯ mg/dL২০০ mg/dL বা বেশি
র‍্যান্ডম প্লাজমা গ্লুকোজনির্দিষ্ট সাধারণ সীমা নেইপ্রযোজ্য নয়ক্লাসিক উপসর্গসহ ২০০ mg/dL বা বেশি

সুস্পষ্ট হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা সংকট না থাকলে সাধারণত দ্বিতীয় অস্বাভাবিক ফল দিয়ে রোগ নিশ্চিত করা হয়। অ্যানিমিয়া, রক্তের কিছু রোগ, সাম্প্রতিক রক্তক্ষরণ বা ট্রান্সফিউশন, কিডনি রোগ এবং গর্ভাবস্থায় HbA1c ব্যাখ্যায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের পরীক্ষার সময় ও সীমা আলাদা।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ

চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু একটি সংখ্যা কমানো নয়; বরং উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, হাইপোগ্লাইসেমিয়া এড়ানো এবং হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি, চোখ, স্নায়ু ও পায়ের জটিলতা প্রতিরোধ করা। পরিকল্পনা ব্যক্তি, ডায়াবেটিসের ধরন, বয়স, পেশা, আর্থিক সামর্থ্য, অন্যান্য রোগ এবং গর্ভাবস্থার ওপর নির্ভর করে।

স্বাস্থ্যকর খাবার

ডায়াবেটিসের জন্য সবার উপযোগী একটিমাত্র ডায়েট নেই। প্লেটের অর্ধেক শর্করাবিহীন সবজি, এক-চতুর্থাংশ উপযুক্ত প্রোটিন এবং এক-চতুর্থাংশ পরিমিত ভাত, রুটি বা অন্য কার্বোহাইড্রেট রাখার পদ্ধতি অনেকের জন্য সহজ। ডাল, ছোলা, মাছ, ডিম, বাদাম, পূর্ণ শস্য, সবজি ও আস্ত ফল বেছে নেওয়া যায়। মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত লবণ ও বড় পরিমাণের অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করা ভালো। ভাত বা ফল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়; পরিমাণ, মোট কার্বোহাইড্রেট এবং ওষুধের সঙ্গে সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ।

শারীরিক কার্যকলাপ

চিকিৎসকের অনুমতি অনুযায়ী সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত হাঁটা বা অন্যান্য অ্যারোবিক কাজ এবং পেশি শক্ত করার ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে। নতুনদের ধীরে শুরু করা উচিত। ইনসুলিন বা হাইপোগ্লাইসেমিয়া ঘটাতে পারে এমন ওষুধ ব্যবহার করলে ব্যায়ামের আগে-পরে গ্লুকোজ, খাবার ও ওষুধের সমন্বয় সম্পর্কে স্বাস্থ্যদলের পরামর্শ দরকার। বুকে ব্যথা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, খুব বেশি গ্লুকোজের সঙ্গে কিটোন বা অসুস্থতা থাকলে ব্যায়াম না করে চিকিৎসা নিতে হবে।

ওষুধ ও ইনসুলিন

টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন অপরিহার্য। টাইপ ২-এ জীবনযাপনের পরিবর্তনের পাশাপাশি মেটফরমিন বা অন্য ট্যাবলেট, ইনজেকশনযোগ্য ওষুধ কিংবা ইনসুলিন লাগতে পারে। কোন ওষুধ উপযুক্ত তা হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ, ওজন, হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও খরচ বিবেচনায় চিকিৎসক ঠিক করেন। অন্যের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ, ওষুধ হঠাৎ বন্ধ বা ডোজ পরিবর্তন বিপজ্জনক।

পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত পরীক্ষা

ব্যক্তিভেদে গ্লুকোজ মাপার সময় আলাদা। অনেকের জন্য সকালে, খাবারের আগে বা খাবার শুরুর দুই ঘণ্টা পরে মাপতে বলা হয়; ইনসুলিন ব্যবহারকারীর আরও ঘন পরীক্ষা লাগতে পারে। অধিকাংশ গর্ভবতী নন এমন প্রাপ্তবয়স্কের সাধারণ লক্ষ্য খাবারের আগে ৮০–১৩০ mg/dL এবং খাবার শুরুর ১–২ ঘণ্টা পরে ১৮০ mg/dL-এর নিচে—তবে বয়স, গর্ভাবস্থা, অন্যান্য রোগ ও হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি অনুযায়ী ব্যক্তিগত লক্ষ্য আলাদা হতে পারে। HbA1c, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, কিডনি, চোখ, পা ও দাঁতের নিয়মিত মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ।

বাস্তবধর্মী উদাহরণ

ধরা যাক, ৪২ বছর বয়সী রফিকের কয়েক মাস ধরে রাতে বারবার প্রস্রাব, বেশি পিপাসা ও ক্লান্তি হচ্ছিল। তিনি ভাবছিলেন গরমের কারণে এমন হচ্ছে। পরিবারে তার মায়ের ডায়াবেটিস ছিল। চিকিৎসক খালি পেটে গ্লুকোজ ও HbA1c পরীক্ষা দিলেন; দুটি ফলই ডায়াবেটিসের সীমায় এলো এবং পুনরায় যাচাইয়ে রোগ নিশ্চিত হলো। রফিক নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ানের সাহায্যে ভাতের পরিমাণ সামঞ্জস্য করলেন, মিষ্টি পানীয় বাদ দিলেন, প্রতিদিন হাঁটা শুরু করলেন এবং চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত নিলেন। কয়েক মাস পর তার ওজন, গ্লুকোজ ও রক্তচাপের উন্নতি হলো। এই উদাহরণটি দেখায় যে লক্ষণকে অবহেলা না করে পরীক্ষা এবং ধারাবাহিক চিকিৎসা কত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো ব্যক্তির জন্য প্রেসক্রিপশন নয়।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায় কি?

টাইপ ১ বর্তমানে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিরোধের সাধারণ পদ্ধতি নেই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে টাইপ ২-এর ঝুঁকি কমানো বা প্রিডায়াবেটিস থেকে অগ্রগতি বিলম্বিত করা যায়। স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে এগোনো, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, বেশি আঁশযুক্ত ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান বর্জন এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং কার্যকর পদক্ষেপ। ঝুঁকি কমানো মানে নিশ্চয়তা নয়; জিনগত ও অন্যান্য কারণও গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিস নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

  • “শুধু চিনি খেলেই ডায়াবেটিস হয়”: ভুল। মোট খাদ্যাভ্যাস, ওজন, জিন, বয়স, কার্যকলাপসহ বহু বিষয় কাজ করে। তবে মিষ্টি পানীয় ও অতিরিক্ত ক্যালরি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • “ডায়াবেটিস হলে ভাত ও ফল নিষিদ্ধ”: ভুল। পরিমাণ ও কার্বোহাইড্রেট পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ; ব্যক্তিগত পরিকল্পনা ডায়েটিশিয়ান দিতে পারেন।
  • “ওষুধ শুরু মানেই ব্যর্থতা”: ভুল। ডায়াবেটিস সময়ের সঙ্গে বদলায়; ওষুধ শরীরকে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে।
  • “লক্ষণ নেই, তাই রোগ নেই”: ভুল। টাইপ ২ দীর্ঘদিন লক্ষণহীন থাকতে পারে।
  • “ভেষজ রস ওষুধের বিকল্প”: প্রমাণিত চিকিৎসার বিকল্প নয়। কিছু ভেষজ ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া বা কিডনি-লিভারের ক্ষতি করতে পারে।

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

ডায়াবেটিস কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?

টাইপ ১-এর স্থায়ী নিরাময় এখনো নেই। কিছু টাইপ ২ রোগীর উল্লেখযোগ্য ওজন কমানো ও চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় ওষুধ ছাড়া স্বাভাবিক মাত্রা থাকতে পারে, যাকে রেমিশন বলা হয়; এটি নিরাময়ের নিশ্চয়তা নয় এবং ফলোআপ দরকার।

ডায়াবেটিস কি ছোঁয়াচে?

না। স্পর্শ, খাবার ভাগাভাগি বা একসঙ্গে থাকার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ছড়ায় না।

ডায়াবেটিস সন্দেহ হলে প্রথমে কোন পরীক্ষা করব?

চিকিৎসক সাধারণত HbA1c, খালি পেটে প্লাজমা গ্লুকোজ বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য পরীক্ষা বেছে নেন। নিজের অবস্থা অনুযায়ী পরীক্ষা নির্ধারণ করাই নিরাপদ।

ডায়াবেটিসে কি ফল খাওয়া যায়?

হ্যাঁ, সাধারণত পরিমিত আস্ত ফল খাওয়া যায়। জুসের তুলনায় আস্ত ফলে আঁশ বেশি থাকে। পরিমাণ ও সময় ব্যক্তিগত পরিকল্পনার অংশ।

রক্তে গ্লুকোজ কত হলে কম ধরা হয়?

সাধারণভাবে ৭০ mg/dL-এর নিচে হাইপোগ্লাইসেমিয়া ধরা হয়। কাঁপুনি, ঘাম, বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হলে দ্রুত নির্ধারিত জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় কি শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট?

সব ক্ষেত্রে নয়। ধরন ও রোগের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ওষুধ বা ইনসুলিন প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসা বদলানো যাবে না।

সারসংক্ষেপ

ডায়াবেটিস হলো ইনসুলিনের ঘাটতি বা কার্যকারিতা কমে যাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে থাকার অবস্থা। বারবার প্রস্রাব, বেশি পিপাসা, ওজন কমা, ঝাপসা দেখা ও ক্ষত শুকাতে দেরি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, তবে লক্ষণ ছাড়াও টাইপ ২ হতে পারে। নির্ভুল ল্যাব পরীক্ষা, চিকিৎসকের মূল্যায়ন, সুষম খাবার, নিয়মিত কার্যকলাপ, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জটিলতার স্ক্রিনিং—এই সমন্বিত পরিকল্পনাই নিরাপদ নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি।

তথ্যসূত্র

মন্তব্য করুন