ইন্টারনেটের আবিষ্কার কিভাবে হয়েছিল ?

ইন্টারনেটের আবিষ্কার কিভাবে হয়েছিল

আধুনিক যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ, বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের যেসব আবিষ্কার মানুষকে সভ্যতার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করতে সহায়তা করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো ইন্টারনেট। ইন্টারনেট বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত গতিময়তার এক মাইল ফলক। বর্তমান বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তির কর্মকাণ্ডকে ইন্টারনেট এমন এক সুতোর বন্ধনে আবদ্ধ করেছে যে, সে সুতো ছিঁড়ে গেলে হয়তো সমগ্র বিশ্বব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়বে। 

স্বাভাবিকভাবে তাই মানুষের মাঝে ইন্টারনেট সম্বন্ধে জানা ও শেখার আগ্রহেরও কোন শেষ নেই। তাই আজকে আমরা আলোচনা করবো ইন্টারনেট কি, ইন্টারনেটের আবিষ্কার কিভাবে হয়েছিল এবং ইন্টারনেট কে আবিষ্কার করেন সে সম্পর্কে। যেখান থেকে আপনারা ইন্টারনেট আবিষ্কার এর আদ্যোপান্ত খুব সহজে এবং সুন্দরভাবে জেনে নিতে পারবেন। তাহলে চলুন মূল কথায় যাওয়া যাক।

ইন্টারনেট কি

ইন্টারনেট (Internet) হলো ইন্টারন্যাশনাল কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সার্ভিস (International Computer Network Service) কথাটির সংক্ষিপ্ত রূপ। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে, অসংখ্য নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্বব্যাপী সুবিশাল কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে ইন্টারনেট বলা হয়। অর্থাৎ, ইন্টারনেট হলো কম্পিউটার এর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক যাকে ইংরেজিতে বলা যায়- World wide electronic network. ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সব কম্পিউটার ডিভাইস অতি দ্রুততার সাথে যোগাযোগ করতে পারে এবং তথ্য আদান প্রদান করতে পারে। 

ইন্টারনেট কে আবিষ্কার করেন

ইন্টারনেট হলো বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নাম এবং একটি বিশাল ‘নেটওয়ার্কিং সিস্টেম’। নিঃসন্দেহে ইন্টারনেট তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী বিপ্লব সাধন করেছে। কিন্তু এই বিপ্লব কখনও এক রাতের মধ্য সংঘঠিত হয়নি বা এটি রাতারাতি কোন একজন ব্যক্তির মাধ্যমে আবিষ্কার হয়ে যায় নি। বস্তুুত ইন্টারনেট এর মতো এই সুবিশাল ও শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শূন্য থেকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে রয়েছে অসংখ্য গবেষক, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর নিরলস প্রচেষ্টা, শ্রম ও অধ্যবসায়।

তবে প্রকৃতপক্ষে ইন্টারনেট আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব দেওয়া হয় Vinton Cerf এবং Bob Kahn নামক দুজন প্রযুক্তিবিদকে। তাঁরা ছিলেন মূলত ডারপা-র অন্যতম দুজন স্বত্বাধিকারী এবং প্রথম সারির গবেষক। এছাড়া ইন্টারনেট আবিষ্কারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারগুলো তাদের হাত ধরেই জন্ম লাভ করে এবং বিকশিত হয়। যেমন- ট্রান্সমিশন কন্ট্রোল প্রটোকল বা TCP এবং এরপর ইন্টারনেট প্রটোকল ( Internet Protocol) বা আইপি (IP). 

ইন্টারনেটের আবিষ্কার এর আদ্যোপান্ত 

ইন্টারনেট উদ্ভাবনের প্রাথমিক কারণ ছিল সামরিক। সর্বপ্রথম মার্কিন সামরিক সংস্থা বিশ্বব্যাপী নিজেদের অবস্থানগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক গোপন যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য এ ধরনের কোন একটি প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করে। তাই তাঁরা ১৯৬০ সালের দিকে কম্পিউটার প্রযুক্তি নিয়ে নতুনভাবে গবেষণা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালে ডারপা (ডিফেন্স অ্যাডভান্স রিসার্চ প্রজেক্ট)- এর একজন অন্যতম আলোচিত এবং প্রথম সারির গবেষক জেসিআর লিকলিডার (JCR Licklider) গ্যালাকটিক নেটওয়ার্ক (Galactic Network) আবিষ্কার করেন।

এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি কম্পিউটারের সঙ্গে অন্য একটি কম্পিউটারের যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। আর এই পদ্ধতিকেই মূলত প্যাকেট সুইচিং (Packet Switching) বলা হয়। তবে সেসময় এনএসএফ ইন্টারনেটের দায়িত্ব নেয়। অর্থ্যাৎ ইন্টারনেটের সকল টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেয় এনএসএফ। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা মাত্র ৪টি কম্পিউটারের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন প্রথম অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর তিনটি কম্পিউটার ক্যালিফোর্নিয়ায় ও একটি ছিল উটাই -তে। আর এই যোগাযোগ ব্যবস্থার নাম ছিল ডার্পানেট (DARPANET)। 

এরপর শুধু বিস্ময়কর সাফল্যের  ইতিহাস। এসময়  এ প্রযুক্তিকে আরও জনকল্যাণমুখী করে তোলার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেওয়া হলে তারা শিক্ষা, গবেষণা এবং তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। তিন বছর যেতে না যেতেই কম্পিউটারের সংখ্যা তখন চার থেকে তেত্রিশ এ পৌঁছায়। ১৯৬৯ সালে প্যাকেট সুইচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে এক কম্পিউটার হতে আরেক কম্পিউটারে তথ্য আদান প্রদানের বিশেষ একটি পথ আবিষ্কৃত হয় এবং নতুন একটি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা সমৃদ্ধ হয়।  

তখন শিক্ষাজগতে এই নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার নামকরণ হয় আরপা নেটওয়ার্ক বা ‘আরপানেট’ (ARPANET- Advanced Research Project Agency Network) হিসেবে। যার উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক আক্রমণ ঠেকানোর জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য আদান প্রদান করা। সত্তর ও আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আরও অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান , বিশ্ববিদ্যালয় এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। সত্তরের দশকে ভিন্ট সার্ফ নামক একজন গবেষক Transmission Control Protocol (TCP) বা Internet Protocol অর্থ্যাৎ আইপি (IP) আবিষ্কার করেন। এখনও পর্যন্ত এই আইপি-ই হলো ইন্টারনেট ব্যবহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার। এককথায় বলতে গেলে মূলত ইন্টারনেট প্রোটোকলের উদ্ভাবন-ই এ প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার মূল শক্তিটি প্রদান করে।

এরপর আশির দশকে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎকর্ষ সাধনের ধারাবাহিকতায় আরও একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার সামনে আসে। আর সেটি হলো ‘ডোমেইন’। ডোমেইন আবিষ্কারের ফলে অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং এটি সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এভাবে ক্রমশ এর চাহিদা বাড়তে থাকলে ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন সর্বসাধারণের জন্য এরকম অন্য একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করেন। এর নাম দেওয়া হয় “নেস্ফেনেট”। 

তিন বছরের মধ্যে ‘নেস্ফেনেট’ এর বিস্তার সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আর তখনই প্রয়োজন দেখা দেয় একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার। আর ঠিক এই মূহূর্তেই ১৯৯১ সালে ইন্টারনেট নিয়ে গবেষণার এই জোয়ারে নতুন করে হাওয়া লাগে। এসময় ইন্টারনেট জগতের সবথেকে যুগান্তকারী আবিষ্কারটি বেরিয়ে আসে এবং অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব আবিষ্কার হওয়ার মাধ্যমে। স্যার টিমোথি জন টিম বার্নার্স লি নামক সুইজারল্যান্ড এর একজন কিংবদন্তি কম্পিউটার প্রোগ্রামার ১৯৮৯ সালে এই World Wide Web আবিষ্কার করেন এবং সে কারণেই তিনি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব এর জনক হিসেবে অভিহিত এবং সর্বাধিক বেশি জনপ্রিয়। এছাড়া একই বছর তিনি https আবিষ্কার করেন। যেটি অসংখ্য কম্পিউটার ডিভাইসের মধ্যে তথ্য আদান প্রাদানের পথটি আরও সহজ করে দেয়।  

এরপর ১৯৯১ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব চালু হওয়ার দুই বছর যেতে না যেতেই ১৯৯৩ সালে ন্যাশনাল সেন্টার ফর সুপারকামিং অ্যাপ্লিকেশনস এর হাত ধরে উদ্ভাবিত হয়ে বিশ্বের প্রথম ওয়েব ব্রাউজার মোজাইক (Mosaic) ওয়েব ব্রাউজার। এই ব্রাউজার এর মাধ্যমে ইন্টারনেট জগতে প্রথমবারের মতো ছবি ও লেখাকে একই সঙ্গে একই পেজের মধ্যে দেখানো সম্ভব হয়ে ওঠে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ইন্টারনেটে চাহিদা ক্রমশ বাড়তে শুরু করে।যার ফলে গত শতকের নব্বই দশকের শুরুতে ইন্টারনেটকে জনসাধারণের ব্যবহার যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আর বিশ্বের মানুষ পরিচিত হয় ‘ইন্টারনেট’ নামক একটি নতুন ধারণার সঙ্গে। 

বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেটের প্রভাব 

ইন্টারনেট ও বর্তমান বিশ্ব তথা আধুনিক জীবনযাত্রা এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক সূত্রে গ্রথিত। এর একটি থেকে অন্যটি বিচ্ছিন্ন হলে যেন সব কিছু অচল হয়ে পড়ে। ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা নানা রকম কাজ অতি দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করতে পারি। তবে ইন্টারনেটে একেক রকম কাজ করার জন্য একেক রকম সফটওয়্যার (Software) প্রয়োজন হয়। যেমন- Net News protocol- এর মাধ্যমে আমরা অতি সহজে ও দ্রুততার সাথে বিশ্বের যেকোন দেশের খবরাখবর জানতে পারি। Telenet ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা অতি দ্রুত দেশ-বিদেশের যেকোন স্থানে অবস্থানরত আপনজনের সাথে কথা বলতে পারি, খোঁজ খবর নিতে পারি বা যেকোন ধরনের তথ্য আদান-প্রদান করতে পারি। 

File transfer protocol ব্যবহার করে আমরা এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে ফাইল আদান-প্রদান করতে পারি। Internet Relay chat protocol ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন স্থানে বসে বিভিন্ন জনের সাথে গল্পগুজব করতে পারি, আড্ডা দিতে পারি। E-mail ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা তথ্য আদান-প্রদান করতে পারি। অর্থ্যাৎ বর্তমান বিশ্বের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ধরনের কাজকর্ম থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য , ব্যাংক-বীমা , অফিস-আদালত , গবেষণা-প্রযুক্তি , শিক্ষা-দীক্ষাসহ সব কাজেই ইন্টারনেট ব্যবহৃত হচ্ছে। এককথায় বর্তমান বিশ্বে আধুনিক জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট। 

উন্নত জীবন ও বিশ্বব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ ইন্টারনেট। বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো অধিকাংশ মানুষের কাছে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে যাবে এবং মানুষের জীবন হয়ে উঠবে আরও উন্নত ও সুখী সমৃদ্ধ।

তো প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আশা করি আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আপনাদের অবশ্যই ভালো লেগে থাকবে। এই আর্টিকেলে আমরা ইন্টারনেটের আবিষ্কার কিভাবে হয়েছিল সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।  এ সম্পর্কে আপনাদের আরও কোন জিজ্ঞাসা থাকলে তা অবশ্যই কমেন্ট বক্সে জানাবেন। 

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published.