হ্যাকিং থেকে বাঁচার উপায়
Spread the love

সাম্প্রতিক সময়ের অনলাইন এবং অফলাইন প্রচার প্রচারণার ফলে আমরা হ্যাকিং সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছি। এছাড়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং এর নিউজ অনেক সময় আমাদের মনে ভীতি তৈরি করে। আজকাল আমাদের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস অনলাইনে সংরক্ষণ করা থাকে। কোন কারনে এগুলো অন্যের হাতে চলে গেলে ভয়ঙ্কর লেভেলের আর্থিক এবং মানুষিক সমস্যায় পড়তে হবে। যাইহোক, অনলাইনে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা অনেক সহজ। শুধু সিকিউরিটি রিলেটেড বিষয়গুলো ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং সচেতন হতে হয়। আপনি অনলাইন জীবন সম্পর্কে যত অসচেতন হবেন আপনার অনলাইন জীবন তত ঝুঁকির মধ্যে পরবে। তাহলে চলুন কি কি উপায়ে নিজেকে হ্যাকিং থেকে সুরক্ষিত রাখা যায় সে সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই।

হ্যাকিং থেকে বাঁচার উপায়

নিজেকে যে কোন ধরনের হ্যাকিং থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আপনাকে কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। আপনি যত বেশি রক্ষণাত্মক হবেন আপনার ডাটা তত সুরক্ষিত থাকবে। আপনার সুবিধার্থে আমরা কিছু প্রয়োজনীয় এবং কার্যকরী উপায় বের করেছি যা আপনাকে হ্যাকার থেকে সুরক্ষা দেবে। কথা না বাড়িয়ে চলুন মূল আলোচনায় ফিরে যাই।

টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন

2FA বা টু স্টেপ ভেরিফিকেশন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সিকিউরিটি টার্ম। বর্তমান প্রায় সকল ডিভাইস এবং অ্যাকাউন্টে এই সিকিউরিটি ফিচার পাওয়া যায়। এই ফিচারের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে লগইন করার জন্য মোবাইলে পাঠানো কোড এন্টার করতে হয়। হ্যাকার যদি আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে চায় তাহলে আপনার মোবাইল সহ হ্যাক করতে হবে। অথবা তার কাছে আপনার ডিভাইসের ফিজিক্যাল অ্যাক্সেস থাকতে হবে। অপরিচিত কারো কাছে আপনার মোবাইলের ডিরেক্ট অ্যাক্সেস নেওয়া অবশ্যই অনেক কঠিন এবং কষ্টকর হবে। এর ফলে আপনি সহজেই নিজের ডিভাইস এবং অ্যাকাউন্ট হ্যাকারের কাছ থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন।

ভিন্ন ভিন্ন পাসওয়ার্ড

পাসওয়ার্ড এমন একটি জিনিস যা আমরা ভুলে যেতে ভালোবাসি। অর্থাৎ আমরা পাসওয়ার্ড অনেক সহজেই ভুলে যাই। যদি অনেকগুলো সার্ভিস ইউজ করার প্রয়োজন পড়ে তাহলে পাসওয়ার্ড মনে না থাকার বিড়ম্বনায় প্রায় সময় পড়তে হয়। এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে আমরা সব অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ইউজ করি। যা সিকিউরিটির প্রশ্নে একদম চরম ভুলের একটি কাজ।

গ্রে হ্যাট হ্যাকার কারা?

কারন একই ধরণের পাসওয়ার্ড সকল অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করলে হ্যাকার একটি অ্যাকাউন্ট অ্যাক্সেস করতে পারলে আপনার আর বাকী সকল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে নিতে পারবে। বিশেষ করে ফিনান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট।এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা আলাদা পাসওয়ার্ড ইউজ করা একটি গুড প্র্যাকটিস। এতে কোন একটি অ্যাকাউন্টে সিকিউরিটি ব্রিচ হলেও বাকি অ্যাকাউন্ট গুলো সুরক্ষিত থাকে।

সিকিউর ইমেইল অ্যাড্রেস 

আমরা যখন কোন সার্ভিস ইউজ করতে চাই সেখানে ইমেইল অ্যাড্রেস দিয়ে অ্যাকাউন্ট ক্রিয়েট করতে হয়। আমরা প্রয়োজনের স্বার্থে অনেক গুলো ইমেইল অ্যাড্রেস খুলে রাখলেও মূল অ্যাকাউন্ট হিসেবে একটি ব্যবহার করে থাকি। উক্ত মূল ইমেইল দিয়েই আমরা সব সার্ভিস সাবস্ক্রাইব করে থাকি। এছাড়া এই মূল ইমেইলেই সকল গুরুত্বপূর্ণ মেইল জমা হয়।

কোন ভাবে হ্যাকার আপনার মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে পারলে সে আপনার সাবস্ক্রাইব করা সকল সার্ভিস সম্পর্কে জেনে যাবে। তখন সে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং মেথড ইউজ করে আপনার সকল সার্ভিস হ্যাক করে অ্যাডভান্টেজ নিতে পারবে। এসকল বিড়ম্বনা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ইমেইল অ্যাড্রেস সিকিউর করতে হবে। ইমেইল সার্ভিস প্রোভাইডারদের প্রোভাইড করা সিকিউরিটি অপশন গুলো অ্যাক্টিভেট করে নিতে হবে। যাতে যে কোন মূল্যে মূল মেইল অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখা যায়।

পাসওয়ার্ড ম্যানেজার

পাসওয়ার্ড ম্যানেজার একটি অনেক কাজের টুল। এটি অফলাইন অনলাইন দুই ভাবেই পাওয়া যায়। সিকিউরিটির সুবিধার্থে ভিন্ন ভিন্ন সার্ভিসের জন্য আলাদা আলাদা পাসওয়ার্ড ইউজ করলে সেগুলো মনে রাখা খুব কঠিন।

এই সমস্যা সমাধানে পাসওয়ার্ড ম্যানেজার টুলগুলো অনেক সাহায্য করে। ফ্রী বা পেইড যে ভার্সন হোক না কেন পাসওয়ার্ড গুলো সিকিউরভাবে ষ্টোর করা যায়। আর ষ্টোর করা সকল পাসওয়ার্ড একটি মাষ্টার পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা থাকে। আবার সেই মাষ্টার পাসওয়ার্ড সম্বলিত অ্যাকাউন্ট টু স্টেপ অথেনটিকেশন দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। মোটকথা পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ইউজ করলে ভিন্ন ভিন্ন পাসওয়ার্ড ইউজ করলেও ভুলে যাওয়ার কোন চিন্তা থাকে না। পৃথিবীর যে কোন জায়গা থেকেই সে পাসওয়ার্ড গুলো ব্রাউজ করা যায়।

শক্তিশালী পাসওয়ার্ড 

সাধারণত শক্তিশালী পাসওয়ার্ড অনেক জটিল এবং হিজিবিজি হওয়ার কারনে আমরা ইউজ করি না। সহজে মনে রাখা যায় এমন পাসওয়ার্ড দিয়ে অ্যাকাউন্ট ইউজ করতে বেশি সাছন্দ বোধ করি। যেমন নাম, জন্ম তারিখ, বাবা মায়ের নাম, মোবাইল নাম্বার, ডিকশনারি ওয়ার্ড ইত্যাদি পাসওয়ার্ড হিসেবে ইউজ করি।

একজন হ্যাকারের কাছে এসকল পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করা কোন ব্যাপার না। এ কারনে সিকিউরিটি এক্সপার্টগন কঠিন এবং সহজে অনুমান করা যায় না এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে বলে। বিশেষ করে ডিকশনারি ওয়ার্ড সব সময় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। কারন ডিকশনারি ওয়ার্ড ইউজ করলে ডিকশনারি অ্যাটাক করে পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করা যায়। কোন অনলাইন পাসওয়ার্ড জেনারেটর ইউজ করার আগে অবশ্যই উক্ত সোর্স এর বিশ্বস্ততা যাচাই করে নেবেন। নাহলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ থেকেই যাবে।

আপডেট ভার্সন সফটওয়্যার 

আপনি আপনার ডিভাইসে যে ধরনের সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন ইউজ করবেন তা সবসময় আপডেটেড রাখবেন। কারন পুরনো ভার্সনে সিকিউরিটি দুর্বলতা থাকা অস্বাভাবিক না এবং এভাবে প্রতিনিয়ত সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন হ্যাক হয়েই থাকে। কিন্তু আপডেট করার সাথে সাথে সিকিউরিটি প্যাঁচ ইন্সটল হয়ে যায়। এতে পুরনো সকল ত্রুটি দূর হয়ে যায় এবং উক্ত সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন সিকিউর হয়।

অপারেটিং সিস্টেম আপডেট 

অপারেটিং সিস্টেমের দুর্বলতার জন্য প্রতিনিয়ত হাজার হাজার সিস্টেম হ্যাক হয়। হ্যাকিং ওয়ার্ল্ডে জিরো ডে অ্যাটাক সাধারণত দুর্বল অপারেটিং সিস্টেমকে টার্গেট করেই করা হয়। এছাড়া নিয়মিত অপারেটিং সিস্টেম আপডেট না করলে অনেক ধরনের ত্রুটি থেকেই যায়। এসকল দুর্বলতা দূর করার জন্য সিস্টেম আপডেট করা অতি জরুরী।

নিয়মিত অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গুলো সিকিউরিটি প্যাঁচ রিলিজ করে থাকে। এগুলো অপারেটিং সিস্টেমের প্রতিটি নতুন এবং পুরনো দুর্বলতা ঠিক করে দেয়, এতে সিস্টেম হ্যাকিং থেকে সুরক্ষিত থাকে। আর যতক্ষণ অপারেটিং সিস্টেম সিকিউর থাকে ততক্ষণ একজন হ্যাকারের পুরো সিস্টেম হ্যাক করা অসম্ভব হয়ে যায়। মোটকথা হ্যাকারকে কোন সুযোগ দিতে নেই।

সিম সয়াপ/সিম ক্লোন 

সাম্প্রতিক সময়ে সিম ক্লোন একটি মারাত্মক সমস্যা। এতে একজন ইউজারের পুরো আইডেন্টিটি হ্যাকার নিজের মত করে ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ যদি আপনার সিম ক্লোন হয় তাহলে হ্যাকার সেই নাম্বার ইউজ করে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে সিমের সাথে কানেক্টেড সকল সার্ভিস ইউজ করতে পারবে।

বিশ্ব সেরা ৫ জন হ্যাকার

এই সমস্যা দূর করার জন্য সবসময় সচেতন থাকতে হয়। তবে সিম ক্লোন রোধ করার জন্য একজন ইউজারের থেকে ভেন্ডর কোম্পানি বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ ভেন্ডর কোম্পানিকে তাদের সার্ভিস সম্পর্কে আরও বেশি সিকিউর এবং সচেতন হতে হবে। অন্যদিকে একজন ইউজার হিসেবে আপনার সিমে কোন অস্বাভাবিক অ্যাক্টিভিটি দেখলে তা অতি সত্ত্বর কাস্টমার কেয়ারে রিপোর্ট করতে হবে।

পর্ণ সাইট থেকে দূরে থাকা 

পর্ণ সাইট গুলো ভাইরাস দিয়ে ভর্তি থাকে। এমন কিছু কিছু পর্ণ ওয়েবসাইট আছে যেখানে প্রতিটি ক্লিকে ম্যালওয়্যার ইন্সটল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আপনি এ ধরণের অবৈধ ওয়েবসাইট ব্রাউজ করে সহজেই হ্যাকিং এর স্বীকার হতে পারেন। অতএব পর্ণ ওয়েবসাইট ভিজিট করা থেকে বিরত থাকু। এতে একাধারে আপনার মনুষ্যত্ব এবং ডাটা সিকিউর থাকবে।

অপরিচিত ইমেইল না খোলা

আমরা যারা বিভিন্ন কারনে ইমেইল ইউজ করি তারা একটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল করেছি যে অপরিচিত মেইল ইনবক্স বা স্প্যাম বক্সে জমা হয়ে আছে। হ্যাক করার জন্য হ্যাকার বিভিন্ন ইমেইল অ্যাড্রেস ইউজ করে ভাইরাস অ্যাটাচমেন্ট হিসেবে সেন্ড করে থাকে। সেই ইমেইল ওপেন করে অ্যাটাচমেন্ট ডাউনলোড করলে তা পুরো সিস্টেম ছড়িয়ে পরে। এই ছড়িয়ে পরা ভাইরাস গোপনে হ্যাকারকে সিস্টেমের দূর্বলতা গুলো জানিয়ে দিয়ে হ্যাক করতে সাহায্য করে। এই ধরনের সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য অপরিচিত ইমেইল অ্যাড্রেস ওপেন করলেও তা থেকে কোন অ্যাটাচমেন্ট ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

লিনাক্স ইউজ করা 

লিনাক্সকে আনহ্যাকেবল বলা হয়। কারন এখন পর্যন্ত লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমে চলার মত ক্ষতিকারক কোন ভাইরাস বের হয়নি। যদি বের হয়েও থাকে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না। কারন লিনাক্স একটি ওপেন সোর্স অপারেটিং সিস্টেম। যার ফলে কোন ভাইরাস তৈরি হলেও তার সিকিউরিটি প্যাঁচ সাথে সাথেই কোন না কোন প্রোগ্রামার তৈরি করে রিলিজ করে দেয়।

পার্সোনাল ইনফরমেশন সোশ্যাল মিডিয়ায় না দেওয়া

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা নিজেদের অনেক ডাটা আপডেট করে থাকি। আর একজন হ্যাকারের হ্যাক করার জন্য যে সকল পার্সোনাল ডাটা দরকার তা আমাদের প্রোফাইল থেকেই পেয়ে যায়। এই সমস্যা দূর করার জন্য আমাদের রক্ষণাত্মকভাবে ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ইউজ করতে হবে।

মূলত সিকিউরিটি অনেকটা সচেতনতার উপর নির্ভর করে। আপনি আপনার ডাটার সিকিউরিটি নিয়ে যদি উদাসীন থাকেন তাহলে আপনার সিকিউরিটি নিয়ে কোন চিন্তা করতে হবে না। তবে আপনার মনে যদি সিকিউরিটি নিয়ে একটুও চিন্তা থাকে তাহলে এই আর্টিকেল আপনাকে অনেক সহায়তা করবে। আশাকরি লেখাটি পড়ে আপনি অনেক উপকৃত হয়েছেন। আপনার মতামত অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন ধন্যবাদ।

By Rezaul Islam Tasin

আমি রেজাউল ইসলাম তাসিন, ২০১৪ থেকে আইটি প্রফেশনের সাথে জড়িত আছি। বই পড়া এবং আইটি নিয়ে ঘাটাঘাটি করা আমার নেশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!