হ্যাকিং গ্রুপ
Spread the love

কোন গ্রুপ তৈরি হয় সাধারণত একই উদ্দেশ্য সম্বলিত ও একই মন-মানুষিকতার এমন কিছু ব্যক্তি নিয়ে। ঠিক তেমনি হ্যাকার দের মধ্যে তারা বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে কাজ করে, কারণ এতে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। গ্রুপের সকল সদস্য মিলে সহজেই তাদের টার্গেটকে দূর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে সাইবার হামলা পরিচালনা করতে বা রোধ করতে হ্যাকারদের টিম হিসেবে কাজ করার প্রয়োজন পড়ে। যাইহোক, বর্তমান বিশ্বে এমন কিছু বিখ্যাত হ্যাকিং গ্রুপ আছে যারা অনেক শক্তিশালী। তাদের কাজের মাধ্যমে ইতিমধ্যে তারা কাজের প্রমাণ দিয়ে দিয়েছে। আমাদের আজকের পোস্টে আমরা বিশ্ব বিখ্যাত ৫ টি হ্যাকিং গ্রুপ সম্পর্কে আলোচনা করবো। 

হ্যাকিং গ্রুপ

বর্তমানে পৃথিবীতে বিখ্যাত এবং শক্তিশালী অনেক হ্যাকিং গ্রুপ বিদ্যমান। তবে এদের মধ্যে কিছু কিছু আছে যারা তাদের ক্ষিপ্ততা এবং হ্যাকিং নলেজ দিয়ে মানুষের মনে ভয় এবং ভালোবাসার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে অ্যানোনিমাস হ্যাকিং গ্রুপের কথা উল্লেখ করা যায়। এরা একটি গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার হ্যাকিং গ্রুপ। তাদের সেবা মূলক কার্যক্রমের কারনে অনেক মানুষ তাদের ভালোবাসে এবং সাপোর্ট করে। তাহলে চলুন অ্যানোনিমাস সহ এরকম আরও চারটি বিখ্যাত হ্যাকিং গ্রুপ সম্পর্কে জেনে নেই।

মাস্টার্স অফ ডিসেপশন

এটি একটি নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক হ্যাকার গ্রুপ। তাদের মূল ধারার হ্যাকিং থেকে ভিন্ন ধরনের কাজের জন্য বিখ্যাত। তাদের গ্রুপের কোন থিম বা মোটিভ নেই। মাস্টার্স অফ ডিসেপশন গ্রুপ তৈরি করেন Acid Phreak নামক একজন হ্যাকার। তার এই হ্যাকার গ্রুপ তৈরি করার পেছনে একটি কারন আছে। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত Legion of Doom নামক একটি হ্যাকার গ্রুপ ছিল। তারা এই পুরো সময় জুড়ে বিভিন্ন হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতো। কিন্তু ২০০০ সালের পর তারা তাদের কার্যক্রম একেবারে বন্ধ করে দেয়।

বিশ্বসেরা ৫ জন হ্যাকাদের জীবনি

মূলত Acid Phreak এই গ্রুপের অনুপ্রেরণায় মাস্টার্স অফ ডিসেপশন গ্রুপ তৈরি করে। তাদের মূল কাজ হলো এক্সপ্লইট তৈরি করা। তারা তাদের নিজেদের এক্সপ্লইট ইউজ করে হ্যাকিং পরিচালনা করে। তাদের প্রধান টার্গেট হলো ফোন কোম্পানি এবং বিভিন্ন কম্পিউটার সিস্টেম। এক্সপ্লইট ইউজ করে এসকল কোম্পানির নেটওয়ার্ক সিস্টেমে প্রবেশ করে সার্ভার হ্যাক করে। তারপর ডাটাবেস থেকে ইউজার নেম এবং পাসওয়ার্ড চুরি করে।

ব্যুরো ১২১

আমরা উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে সবাই জানি। কিম জন উন তার শাসন আমলে পুরো দেশকে একটি সামরিক জেলখানা বানিয়ে দিয়েছে। সে দেশে কি চলে না চলে সে ব্যাপারে বিশ্বের কেউ জানে না। সেখানে মানুষ সরকারের সিধান্তে চলে। পুরো দেশকে গোটা বিশ্ব থেকে গোপন করে রাখা হয়েছে। এরকম সামরিক শাসনের কারনে অন্যান্য সব দিকে যেমন উন্নতি হয়েছে ঠিক তেমনি তারা টেকনোলজিতেও অনেক এগিয়েছে। বিভিন্ন তথ্য মতে উত্তর কোরিয়া ব্যুরো ১২১ নামে ভয়ংকর হ্যাকার গ্রুপ পরিচালনা করে। ব্যুরো ১২১ তাদের সামরিক বাহিনীর একটি অংশ।

ধারণা করা হয় সেখানে ১৮০০ এর বেশি উত্তর কোরিয়ান নাগরিক চাকরী করে। তাদের সবাই নর্থ কোরিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ অটোমেশন থেকে কম্পিউটার সাইন্সে ডিগ্রীপ্রাপ্ত। তাদের নিয়োগ দেওয়ার সাথে সাথে ৫ বছর হ্যাকিং শেখানোর ট্রেনিং দেওয়া হয়। ব্যুরো ১২১ এর প্রতিটি হ্যাকার সিক্রেট এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ তাদের ফ্যামিলি, আত্মীয় স্বজন বা পরিচিতরা এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। এমনকি ব্যুরো ১২১ এ কাজ করা ১৮০০ মানুষ একে অপরকে চেনে না বা তারা যে একই গ্রুপের সদস্য সেটাও জানে না। এই কঠিন নিয়মের মাধ্যমে তাদের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হয়।

যাইহোক, ব্যুরো ১২১ একটি নর্থ কোরিয়ান হ্যাকার গ্রুপ যা তাদের সামরিক বাহিনীর একটি অংশ। তারা তাদের এজেন্টদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেয় যাতে তাদের কার্যক্রম কেউ ট্র্যাক করতে না পারে। তাদের প্রধান টার্গেট হলো দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকা। ২০১৪ সালে তারা সনি পিকচারস এর সার্ভার হ্যাক করে মুভি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। এছাড়া তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় ইতিহাসের সব থেকে বড় কম্পিউটার হ্যাকের ঘটনা ঘটায়। তারা উক্ত দেশের মোট ৩০ হাজার কম্পিউটার অকেজো করে দেয়। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার মিডিয়া এবং ব্যাংকিং সহ অন্যান্য মাধ্যম একদম মুখ থুবড়ে পরে।

অ্যানোনিমাস

 এটি একটি অতি পরিচিত এবং বিশ্বের সব থেকে জনপ্রিয় একটি হ্যাকিং গ্রুপ। তাদের কোন নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম, দেশ নেই। অ্যানোনিমাস কে হ্যাকার গ্রুপ না বলে মতাদর্শ বললেও ভুল হবে না। কারন তারা অন্যায়, অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে হ্যাকিং এর মাধ্যমে প্রতিবাদ করে। বিভিন্ন সামাজিক অসামঞ্জস্যতায় তারা সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। ২০০৩ সালে পৃথিবী পরিবর্তন করার মোটিভ নিয়ে অ্যানোনিমাস তাদের যাত্রা শুরু করে। তারা মূলত ডস বা ডিডস অ্যাটাক পরিচালনা করে থাকে। এই অ্যাটাকের মাধ্যমে সার্ভার ক্রাশ করিয়ে ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশন বন্ধ করিয়ে দেওয়া হলো তাদের কাজ।  

শুরুর দিকে তারা বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটে হামলা পরিচালনা করতো। এর সাথে সাথে তারা ভিসা, মাষ্টারকার্ড, সনি এবং পেপালের উপর সাইবার হামলা পরিচালনা করে। প্রতিক হিসেবে তারা স্প্যানিশ বিপ্লবী গাই ফক্সের আইকনিক মাস্ক ব্যবহার করে। এছাড়া মাথা বিহীন কোট টাই পরা একজন ব্যক্তির প্রতিক তাদের লোগো হিসেবে ইউজ করে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই তাদের সদস্য আছে। তারা নিজেদের অ্যানোন হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের ফ্যান ফলোয়াররা তাদেরকে ডিজিটাল মাফিয়া বা ডিজিটাল রবিনহুড নামেও ডাকে।

সিরিয়ান ইলেক্ট্রনিক আর্মি 

এটি পুরোপুরি সিরিয়ান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়। ২০১১ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাসার-আল-আসাদ এই প্রোজেক্ট চালু করেন। তারা সিরিয়ার ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য কাজ করে। তারা সবসময় ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে টার্গেট করে হ্যাকিং পরিচালনা করে। এ পর্যন্ত তারা ফিনান্সিয়াল টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি নিউজ, আল-জাজিরা, সিবিসি নিউজ ইত্যাদি নিউজ প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে।

কি কি উপায়ে হ্যাক করা হয়?

তাছাড়া কোন মিডিয়া সিরিয়ার বিরুদ্ধে কোন নিউজ করলেও তারা সে মিডিয়া হ্যাক করে প্রতিবাদ জানায়। সরকার তাদের সরাসরি আর্থিক সাহায্য করে যার ফলে তারা অনেক শক্তিশালী একটি হ্যাকার গ্রুপ। তারা নিয়মিত বিভিন্ন সাইবার ওরে অংশগ্রহণ করে থাকে। সিরিয়ান ইলেক্ট্রনিক আর্মি হ্যাক করার জন্য ডিডস, ফিশিং, স্পামিং সহ অন্যান্য হ্যাকিং মেথড ইউজ করে। এ পর্যন্ত তারা লিংকডিন, টুইটার, ট্রুকলার, ভাইবার সহ অনেক অ্যাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাক করেছে। মোটকথা তারা ব্যুরো ১২১ এর মত অনেক শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় হ্যাকার গ্রুপ।

লিজার্ড স্কোয়াড 

লিজার্ড স্কোয়াড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। মোট সাত জন হ্যাকার সদস্য নিয়ে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে। বর্তমানে যত গুলো ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার গ্রুপ আছে লিজার্ড স্কোয়াড তাদের মধ্যে অন্যতম। তারা মূলত গেম কোম্পানি এবং গেম সার্ভার হ্যাক করে। তাদের প্রধান কাজ হলো প্লেষ্টেশন এবং এক্সবক্সের অনলাইন সার্ভার বন্ধ করে দেওয়া। এর পাশাপাশি অন্যান্য অনেক হ্যাকিং এর সাথে তারা তাদের সম্পৃক্ততা দাবী করে। যেমন টেইলর সুইফট এর টুইটার ও ইন্সটাগ্রাম হ্যাক করার সহ ফেসবুক এবং টিন্ডার হ্যাক করার কথা ঘোষণা করে। তবে বাস্তবিক অর্থে তারা এগুলো মিথ্যা ঘটনা মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ছড়িয়েছিল।

 বর্তমান সময় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ নিজেকে হ্যাকিং থেকে রক্ষা করার জন্য হ্যাকিং শিখতেছে। তেমনি সাইবার ওয়্যারে অংশগ্রন করার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার নিজস্ব চেষ্টায় হ্যাকারদের সরাসরি সাপোর্ট দিচ্ছে। এসকল কারনে হ্যাকার গ্রুপের প্রচার এবং প্রসার অন্যান্য সময়ের থেকে অনেক বেশি হচ্ছে। আশাকরি এই লেখা পড়ে বর্তমান সময়ের সব থেকে বিখ্যাত হ্যাকিং গ্রুপ সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছেন। আপনার মতামত অবশ্যই আমাদের কমেন্ট করে জানাবেন। 

By Rezaul Islam Tasin

আমি রেজাউল ইসলাম তাসিন, ২০১৪ থেকে আইটি প্রফেশনের সাথে জড়িত আছি। বই পড়া এবং আইটি নিয়ে ঘাটাঘাটি করা আমার নেশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!