টরেন্ট কি? কিভাবে কাজ করে?

টরেন্ট কি? কিভাবে কাজ করে?

টরেন্ট (torrent) বর্তমানে ইন্টারনেটে ফাইল ডাউনলোড ও আপলোডের জন্য অনেক জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। তবে টরেন্ট কিভাবে কাজ করে এই বিষয়টি অনেকেরই অজানা ও অনেক কৌতূহলও রয়েছে। আজকে এই টরেন্ট বিষয়ে সকল এডভান্স বিষয় গুলো জানব। সহজে এবং অনেক দ্রুত গতিতে ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন ফাইল যেমন- মুভি, গেমস, অডিও, ভিডিও, পাইরেটেড অ্যাপ অথবা সফটওয়্যার ডাউনলোড ও আপলোডের জন্য অসংখ্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারী টরেন্ট এর সহযোগিতা নিয়ে থাকেন। আজকের আলোচনার বিষয় হলো টরেন্ট কি? কিভাবে কাজ করে? এবং টরেন্টের সুবিধা ও অসুবিধা সহ আরও অনেক কিছু সম্পর্কে। তাহলে চলুন প্রথমেই জেনে নেয়া যাক টরেন্ট কি।

টরেন্ট কি? 

সহজভাবে বলতে গেলে, টরেন্ট হলো এক ধরনের ডেটা ট্রান্সফার এবং শেয়ার পদ্ধতি যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোন একটি ডেটা ডাউনলোড করতে একক কোন সার্ভারের উপর নির্ভর করতে হয় না। বিষয়টিকে এখন একটু পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা যাক। সাধারণত ইন্টারনেট থেকে আমরা যখন কোন একটি ফাইল নির্দিষ্ট কোন ওয়েবপেজ থেকে ডাউনলোড করি তখন সেটি মূলত একটি একক সার্ভার থেকে ট্রান্সফার হয়ে থাকে। অর্থাৎ ঐ ওয়েবপেজের যেই নির্ধারিত সার্ভার রয়েছে সেই সার্ভার থেকেই নির্দিষ্ট ফাইলটি আমাদের ডিভাইসে ট্রান্সফার হয়। 

এক্ষেত্রে ডাউনলোডার বেশি হলে এবং ইন্টারনেট স্পীড কম থাকলে ডাউনলোড স্পীডও অনেক কম থাকে। যার ফলে একটি ফাইল ডাউনলোড হতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক সময় লেগে যায়। এছাড়া ঐ সার্ভারটি যদি কোন কারণে বন্ধ হয়ে থাকে তাহলে ঐ সার্ভার থেকে কোন ফাইল ডাউনলোড করা অসম্ভব হয়ে পরে। কিন্তু টরেন্ট এর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কেউ যখন কোন একটি টরেন্ট সাইট থেকে নির্দিষ্ট কোন ফাইল তার কম্পিউটারে ডাউনলোড করতে থাকেন তখন সেই ডাউনলোডার নিজেই একজন আপলোডার হয়ে যান। অর্থাৎ তার কম্পিউটারটিও সে সময় একটি সার্ভারে রূপান্তরিত হয়। 

যার মানে হলো সে সময় যদি দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি ঐ একই ফাইল ঐ টরেন্ট সাইট থেকে ডাউনলোড করার চেষ্টা করেন তাহলে প্রথম ব্যক্তির কম্পিউটার থেকে ঐ ফাইলটি দ্বিতীয় ব্যক্তির কম্পিউটারে ট্রান্সফার হওয়া শুরু করবে। যে কারণে প্রথম ডাউনলোডার যেমন একটি সার্ভার থেকে ডাউনলোড শুরু করেছিলেন, সেখানে দ্বিতীয় ডাউনলোডার একই সঙ্গে দুটি সার্ভার থেকে ডাউনলোড করার সুযোগ পাচ্ছেন। 

এভাবে একটি ফাইলের ডাউনলোডার যত বেশি হবে তার আপলোডার অর্থাৎ সার্ভারের সংখ্যাও তত বাড়বে। ফলশ্রুতিতে ঐ ফাইলটির ডাউনলোড স্পীডও তত বাড়বে। আর এভাবে এই পদ্ধতিতে যেহেতু একই সঙ্গে হাজার হাজার সার্ভার অর্থাৎ কম্পিউটার একে অন্যের সাথে ফাইল শেয়ার করে থাকে তাই এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পাইরেটেড ফাইল, মুভি, গেমস, অডিও, ভিডিও এবং সফটওয়্যার খুব সহজে এবং অনেক দ্রুত গতিতে ডাউনলোড করা যায়। 

টরেন্ট কিভাবে কাজ করে? 

টরেন্ট কীভাবে কাজ করে অর্থাৎ টরেন্টের কাজ করার পদ্ধতি প্রাথমিকভাবে একটু জটিল মনে হলেও বিষয়টি আসলে ঠিক ততটাও জটিল নয় যদি আপনি এর আসল কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়ে যান।

Torrent -এর কাজ করার পদ্ধতি

টরেন্ট এর কাজ করার প্রক্রিয়া শুরু হয় মূলত একটি Torrent Software থেকে। সবথেকে জনপ্রিয় দুটি টরেন্ট সফটওয়্যার হলো ইউটরেন্ট (μTorrent) এবং বিটটরেন্ট (BitTorrent). এবার যখন কোন ইউজার এদের মধ্যে কোন একটি সফটওয়্যারে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট কোন একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তার প্রয়োজনীয় একটি ফাইল ডাউনলোড করার চেষ্টা করবেন, তখন সেই ফাইলটি অন্য কোন একটি সার্ভার থেকে তার ডিভাইসে ট্রান্সফার হতে থাকবে। অর্থাৎ ডাউনলোড হতে থাকবে।  

এক্ষেত্রে এই ডাউনলোডার যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ ফাইলটি ডাউনলোড করছেন অথবা তিনি ডাউনলোড শেষ হওয়ার পরও যদি ইন্টারনেট সংযোগ বজায় রাখেন অর্থাৎ ফাইল যদি তখনও টরেন্ট এর আওতায় থাকে তাহলে ঐ ডাউনলোডার তখন একজন আপলোডারের ভূমিকায় থাকবেন। আর তার ডিভাইসটি একটি সার্ভার হিসেবে কাজ করবে। যেখান থেকে আরও অন্যান্য ডাউনলোডাররা ঐ ফাইলটি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। 

এভাবে কোন একটি ফাইল যদি একসঙ্গে ২০০ জন ব্যক্তি ডাউনলোড করেন তাহলে প্রত্যেকে ১৯৯ টি করে সার্ভার পাচ্ছেন একটি মাত্র ফাইল ডাউনলোড করার জন্য। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ঐ ফাইলের ডাউনলোড স্পীড অনেক বেড়ে যায়। আর ঠিক সে কারণে দ্রুত গতির ডাউনলোড পদ্ধতি হওয়ায় টরেন্ট এখন এত বেশি জনপ্রিয়। 

এখন নিশ্চই টরেন্ট এর কাজ করার পদ্ধতি সম্পর্কে আশা করি এখন ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন। এ সম্পর্কে আরেকটু পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার জন্য এ পর্যায়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করবো। যেমন- সীডার্স কি এবং লীচার্স কি অথবা সীডার্স ও লীচার্স বলতে কি বুঝায়। 

সীডস (seeds) বা সীডার্স (seeders) কি? 

সীডস বা সীডার্স হলেন তারা যারা কোন ফাইল শুধুমাত্র শেয়ার বা আপলোড করছেন। অর্থাৎ ফাইল ডাউনলোড করা শেষ হয়ে গেলেও তিনি ঐ ফাইলটিকে টরেন্টের ট্র্যাকার (tracker) এর মধ্যে রেখেছেন যেখান থেকে যে কেউ ঐ ফাইলটি download করে নিতে পারেন।  

লীচার্স বা পীরস (peers) কি? 

লীচার্স বা পীরস হলেন তারা যারা কোন ফাইল একই সময় ডাউনলোড এবং আপলোড করছেন। এখানে লীচার্স এবং পীরস এর মাঝে খুব সূক্ষ একটি পার্থক্য রয়েছে। যেটি হলো যেসব ইউজার মূলত লীচার্স হিসেবে টরেন্টে join করে থাকেন তারা মূলত কোন ফাইল ডাউনলোড হয়ে গেলে সেটি আপলোডের জন্য আর অপেক্ষা করেন না।  

অর্থাৎ বেশিরভাগ সময় তারা কোন ফাইল ডাউনলোড করা হলে সঙ্গে নেটওয়ার্ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। যার ফলে ফাইলটি আর আপলোড হয়না। আর অপরদিকে পীরসরা সবসময় একটি ফাইল ডাউনলোড করেন এবং ডাউনলোড হয়ে গেলেও এরপর আপলোড করার জন্য অপেক্ষা করেন।

এভাবে কোন একটি ফাইলের সীডস এবং পীরস যত বেশি হবে সেই ফাইলের ডাউনলোড স্পীডও তত বেশি হবে। তাই টরেন্ট থেকে কোন ফাইল ডাউনলোড করার পূর্বে সেটির পীরস এবং সীডস চেক করে নিন। যেটির সীডার্স এবং লীচার্স যত বেশি হবে সেটি তত দ্রুত ডাউনলোড করতে পারবেন।

কিভাবে টরেন্ট থেকে ফাইল ডাউনলোড করবেন? 

মোবাইল অথবা পিসি যার মাধ্যমেই আপনি টরেন্ট থেকে ফাইল ডাউনলোড করুন না কেন এর downloading প্রসেস সাধারণত একই রকম। তাই যেকোন ডিভাইস থেকে টরেন্ট ফাইল ডাউনলোডের জন্য নিম্নোক্ত দিকনির্দেশনাগুলো অনুসরণ করতে পারেন। টরেন্ট থেকে ফাইল ডাউনলোড করার পদ্ধতি-

স্টেপ-1: 

টরেন্ট থেকে ফাইল ডাউনলোডের জন্য প্রথমে আপনার ডিভাইসে একটি টরেন্ট ক্লায়েন্ট সফটওয়্যার ডাউনলোড করে নিতে হবে। বর্তমানে ইন্টারনেটে এরকম প্রচুর সফটওয়্যার রয়েছে। তন্মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় দুটি সফটওয়্যার হলো ইউটরেন্ট (μTorrent) এবং বিটটরেন্ট (BitTorrent). আপনি যদি এন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করেন তাহলে সেক্ষেত্রে μTorrent সফটওয়্যারটিকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। অন্যথায় বিটটরেন্ট সফটওয়্যারটিও ইউজ করতে পারেন। 

স্টেপ-2: 

সফটওয়্যার ইন্সটল করা হয়ে গেলে আপনার পছন্দের যেকোন একটি ব্রাউজার থেকে একটি টরেন্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। কয়েকটি জনপ্রিয় টরেন্ট ওয়েবসাইটের নাম এবং লিংক সহ নিচে দেয়া হলো। 

এদের মধ্যে আপনার পছন্দমতো যেকোন একটি সাইট ব্যবহার করতে পারেন।

স্টেপ-3: 

যেকোন একটি টরেন্ট ওয়েবসাইটে যাওয়ার পর আপনার দরকারি যেকোন কিছু যেমন- কোন মুভি, গান অথবা গেমস এর নাম লিখে সার্চ দিন। এরপর আপনার প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট ফাইলটির একটি টরেন্ট ফাইল তৈরি করুন। এবার সেই ফাইলটিকে টরেন্ট ডাউনলোডার বা সফটওয়্যার এর সঙ্গে যুক্ত করুন এবং ডাউনলোড অফশনটি সিলেক্ট করুন। 

স্টেপ-4: 

এখন টরেন্ট ডাউনলোডার অথবা টরেন্ট সফটওয়্যার যাই-ই বলি না কেন অর্থ্যাৎ μTorrent বা BitTorrent -এ যেয়ে দেখুন যে টরেন্ট ফাইলটি ডাউনলোড হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। এভাবে ডাউনলোড সম্পূর্ণ হওয়ার পরে যেকোন সময় আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী সেই ফাইলটি ওপেন করতে পারেন। এভাবে একটি টরেন্ট ডাউনলোডার এবং টরেন্ট সাইটের সাহায্যে যেকোন দরকারি ফাইল ইন্টারনেট থেকে অনেক কম সময়ের মাঝে ডাউনলোড করে নিতে পারেন।

টরেন্ট এর সুবিধা ও অসুবিধা 

টরেন্ট ব্যবহারে রয়েছে নানামুখী সুযোগ সুবিধা। আর সে কারণেই ডেটা শেয়ারের এই সহজ ও ইউনিক পদ্ধতিটির জনপ্রিয়তা এখন আকাশ ছোঁয়া। তাহলে চলুন এ পর্যায়ে আমরা টরেন্ট ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেই। 

Torrent এর সুবিধা

  • টরেন্ট ব্যবহারের সবথেকে বড় সুবিধাটি হলো এখান থেকে যেকোন সময় যেকোন ধরনের ফাইল যেমন- মুভি, অ্যাপ, সফটওয়্যার, গান, ভিডিও, অডিও এবং এ ধরনের অন্য যেকোন ফাইল ডাউনলোড করা যায়। 
  • এছাড়া টরেন্ট এর মাধ্যমে বিভিন্ন পাইরেটেড ফাইলও ডাউনলোড করা সম্ভব। 
  • টরেন্ট থেকে কোন ফাইল ডাউনলোড করলে তার ডাউনলোড স্পীড সাধারণের তুলনায় অনেক অনেক বেশি হয়ে থাকে। 
  • ফাইল ডাউনলোডের জন্য কোন একক সার্ভারের উপর নির্ভর করতে হয় না। 
  • ডিভাইসের নেট স্পীড দ্বারা টরেন্ট এর ডাউনলোড স্পীড কখনোই প্রভাবিত হয় না। তাই ইন্টারনেট স্পীড স্লো থাকলেও টরেন্টে কোন ফাইল আটকে থাকেনা। বরং অনেক দ্রুত ডাউনলোড হয়ে যায়।

Torrent এর অসুবিধা

  • টরেন্ট ব্যবহারে নিজস্ব ডেটার প্রাইভেসি এবং সিকিউরিটি হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। 
  • পাইরেটেড ফাইল ডাউনলোড করলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়ার কারণে আইনের কাছে জবাবদিহিতার স্বীকার হতে পারে। 
  • অনেকক্ষেত্রে টরেন্ট এর ফাইলগুলোতে ভাইরাস সংক্রমণ হয়ে থাকে। যে কারণে একজন ডাউনলোডার এর ডিভাইস ঐ ভাইরাসের কারণে সংক্রমিত হতে পারে। 
  • ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক ছাড়া কোন মোবাইল ডেটা ইউজ করলে সেক্ষেত্রে অনেক এমবি খরচ হতে পারে।  

সতর্কতা

টরেন্ট থেকে ফাইল ডাউনলোড করার সময় জরুরি ভিত্তিতে অবশ্যই কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কেননা টরেন্ট সাইটগুলোতে অসংখ্য পাইরেটেড ফাইল থেকে থাকে। যেগুলো ডাউনলোড করলে অথবা করার চেষ্টা করলে আইনের নিকট জবাবদিহি করতে হবে এবং অনেকসময় কড়া শাস্তিও হতে পারে। তাই এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য এক্ষেত্রে যেকোন একটি ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করুন যাতে করে আপনার আসল পরিচয় এবং লোকেশন গোপন থাকে। 

তবে আমরা আশা করব সবসময় নেতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং কাজকর্ম বাদ দিয়ে যথাসম্ভব ইতিবাচকতা নিয়ে বাঁচব। সুতরাং টরেন্ট এর অভ্যন্তরীণেই সুবিধাটি কাজে লাগিয়ে কোন অননুমোদিত বা পাইরেটেড ফাইল ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকবো।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published.